জন বার্জার এর ‘ওয়েজ অব সিইং (Ways of Seeing)’ – বই আলোচনা ও ব্যক্তিগত কিছু অভিমত

10989135_916240848389112_1580289839808616001_n

[ বইটির অনুবাদ করেছেনঃ শিল্প ও শিল্পের ইতিহাস বিষয়ক জ্ঞান অন্বেষী ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট আসমা সুলতানা মিতা এবং শিল্পবোদ্ধা বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক কাজী মাহবুব হাসান, প্রচ্ছদ করেছেন আসমা সুলতানা মিতা স্বয়ং। প্রকাশক- অনার্য প্রকাশনী, মূল্য ৩০০ টাকা ] 

মূল বই পরিচিতিঃ

শিল্পসমালোচক জন বার্জারের ‘ওয়েজ অব সিইং’ হচ্ছে, শিল্পকর্ম দেখবার বই, শিল্পের প্রতি ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির বই, শিল্প বিষয়ে পৃথিবীর যেকোন ভাষায় লেখা সবচেয়ে প্রভাবশালী বই, যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে। এই বইটি মূলত ছিল একই বছর ‘বুকার পুরস্কার’ পাওয়া জন বার্জার  এর শিল্প সমালোচনা বিষয়ক একটি টিভি সিরিজ ‘Ways of Seeing’ এর একটি স্বতন্ত্র প্রকাশ, প্রামাণ্যচিত্রটি সম্প্রচারিত হয় বিবিসি(BBC)-তে  যার জনপ্রিয়তাই মূলত তাদের উদ্বুদ্ধ করছিল সেটিকে বই আকারে বের করায়। মোট পাঁচ জনের ( মুলতঃ জন বার্জার, এস’ভেন ব্লুমবার্গ, ক্রিস ফক্স, মিশেল ডিব, রিচার্ড হলিস) সম্মিলিত পরিশ্রমে ‘ওয়েজ অব সিইং’ বই আকারে বের হয়েছিল। বইটি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ যার পথ ধরে সাথে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে শিল্পী-শিল্পরসিক ও শিক্ষার্থীরা, সারা বিশ্বেই বইটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে নিয়মিতভাবে, শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার পাঠ্য হিসেবে।

‘ওয়েজ অব সিইং’ বইটির সাতটি অধ্যায় রয়েছে। চারটি প্রবন্ধের, আর বাকি তিনটি শুধুমাত্র চিত্র সম্বলিত। সবকিছুই প্রতিবর্তিত হয়েছে আর্ট নিয়ে, কিভাবে আর্টকে দেখা হয়, কিভাবে এর মূল্য আরোপ করা হয়, কিভাবে তা ব্যবহার হয় এবং আর্টের দিকে তাকিয়ে আমরা কি দেখতে-শিখতে পারি। প্রথম অধ্যায়ের প্রবন্ধ রচনায় আমরা পাই, কিভাবে সেই আদিকাল থেকে শিল্প বা আর্টকে অতীন্দ্রিকরণ করা হয়েছে আমাদের পূর্বধারণা, কালিক জ্ঞান ও পারিপার্শ্বিকতা দিয়ে, শুধু তাই নয়, কিভাবে কোন প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের সুবিধা মত স্বার্থসিদ্ধির নিমিত্তে একটি  চিত্রকর্মের অর্থ অস্পষ্ট করেছে, এবং সময়ে সময়ে পুনঃমুদ্রণের মাধ্যমে তার অর্থকে পরিবর্তিত করেছে। তৃতীয় অধ্যায়টি শিল্পকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েঃ নারী ও নগ্নতা, কিভাবে নারীকে দেখা হয়, কারা দেখে, অন্যেরা তাদের দেখছে এই বিষয়টি নারী কিভাবে দেখে এমন প্রশ্ন উত্তর খোঁজার আন্তরিক অভিজ্ঞানে। জন বার্জার দেখিয়েছেন কিভাবে নারীর নগ্নতাকে উপজীব্য করে তাকে পণ্যে পরিনত করা হয়েছে, আবার একই সাথে ব্যাখ্যা করেছেন বিখ্যাত শিল্পীদের চিত্রকলায় নারীদেহের নগ্ন উপস্থিতির শৈল্পিক গুরুত্ব। এই অধ্যায়ের আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, তিনি নগ্নতা আর আবরনহীনতার পার্থক্য করেছেন স্পষ্টভাবে, যা এক কথায় অবিস্মরণীয়। পঞ্চম অধ্যায়টি তৈলচিত্র নিয়ে, ইউরোপের ষোড়শ শতকের শুরু থেকে উনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত আঁকা তৈলচিত্রের ধরণ নিয়ে, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন তৈলচিত্রের উপকরণের সাথে মালিকানা সম্পর্ককে ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসেবে, পুঁজিবাদী পণ্য হিসেবে এবং অর্জিত মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে। সপ্তম অধ্যায়ে ব্যক্তিমালিকানার সাথে শিল্পকর্মের সম্পর্ক আরও সুচারু রুপে প্রবন্ধিত হয়েছে প্রকাশন, বিজ্ঞাপণ, যৌনতা এর ভোগবাদী উপস্থাপনার সাথে মেল বন্ধন করে।

অনুবাদকের অনন্য ‘প্রাক কথনঃ  

এই অংশটিতে বইটির অনুবাদক বইটির খুব ভালো প্রিভিউর-এর কাজ করার পাশাপাশি বইটির সময়োপযোগী প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরছেন, ঠিক কি কি কারণে এই বইটি এদেশের পাঠকসমাজের জন্য অপরিহার্য তা দৃঢ়তার সাথে বলা হয়েছে।  অনুবাদক শুরুতেই দেখিয়েছেন যে, শিল্প সমালোচনাও তার নিজের দাবীতেই একটি পরিশুদ্ধ শিল্পরুপ আর বৃটিশ জন বার্জার হচ্ছেন সেই শিল্প সমালোচক যিনি শিল্পসমালোচনাকে সৃজনশীলতার একটি নতুন মাত্রা দিতে সক্ষম হয়েছন। যিনি শিল্পকলাকে ব্যাখ্যা করেছেন খুবই স্বতন্ত্র একটি দৃষ্টিকোণ থেকে। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি শিল্পকলার এই অসীম জগৎটাকে কিছুটা হলেও বা অনেকটাই পরিচিত করে তুলেছেন শিল্পপ্রেমিকদের কাছে। প্রাক কথনে আরও উঠে এসেছে বাংলা ভাষায় ইতিহাস, নন্দনতত্ব বা শিল্প সমালোচনা নিয়ে জানার অত্যন্ত সীমাবদ্ধ পরিসরের প্রসঙ্গ।

”…জানার অসীম আগ্রহ নিয়ে আমরা খুঁজেছি কিন্তু শিল্পকলার ব্যপকতা নিয়ে আমাদের সেই জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে পারে এমন কোনো বইয়ের সন্ধান মেলেনি সহজে। শিল্পী ও লেখক হিসেবে, সেই ঘাটতি পূরণের প্রচেষ্টায় অনুবাদ একটা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমাদের ধারণা। সেই কথাটি মনে রেখেই জন বার্জারের ‘ওয়েজ অব সিইং (Ways of Seeing)’ বইটা অনুবাদ করা অত্যন্ত আবশ্যিক বলেই আমরা বিশ্বাস করেছি। …”

 

পরিসমাপ্তিতে অনুবাদক লিখেছেন,

‘‘স্পষ্টতই জন বার্জার এর এই বইটি শুধু শিল্পকলার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে রচিত নয় বরং এর গঠন ও ব্যাখ্যা ইঙ্গিত দেয় এটি রচিত হয়েছে  আরো বৃহৎ পরমন্ডলের পাঠকদের উদ্দেশ্যে। তিনি তাঁর ধারালো যুক্তির ধারে শিল্পকলার ব্যাখ্যায় সব রহস্যময়তাকে বর্জন করে সুস্পষ্ট করতে চেয়েছেন এর মূল সত্যগুলোকে। সেকারণেই আলোকচিত্রী, শিল্পসমালোচক, চিত্রকর, ডিজাইনার, ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞানের যে কেউই উপকৃত হবেন ‘ওয়েজ অব সিইং’ বইটি পড়লে। বইটা শিল্পকলার ইতিহাসের জগতে, এমন একটি মাইল ফলক যেখান থেকে আমরা পেছনে ফিরে অতীতের শিল্পকলাকে যেমন চিনতে ও বুঝতে শিখি, তেমনি ভবিষ্যতের শিল্পকলার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে। আমরা সেতু বন্ধন করতে সক্ষম হই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পকর্মের নিজস্ব সেই ভাষাটির সাথে।’’

 

অনুবাদ ও অনুবাদক প্রসঙ্গেঃ

এবার আসি বইটির অনুবাদ প্রসঙ্গে। যারা এই বই সংশ্লিষ্ট প্রামাণ্যচিত্রটি দেখেছেন, তারা দেখবেন জন বার্জার তার আলোচনায় দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেছেন, অনেক গুলো ছোট ছোট বাক্যকে এক করে অনেক সময় ধারা-বিবরণীর মত বলে গেছেন। এর মূল কারণটা সহজেই বোঝা যায়। শিল্পকর্ম দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির যে পারস্পরিক সহবস্থান উপস্থাপন করা হয়েছে বইটিতে তার আন্তঃসম্পর্ক  যথাযথভাবে বোঝানোর জন্যেই- এই সুদীর্ঘ বাক্যের ব্যবহার। একটি জটিল ও নিরন্তর সমালোচনা ও বিশ্লেষনিক বিষয়ে তাই ব্যবহার করা হয়েছে ভারী তথাপি সাবলীল প্রবন্ধের ভাষা। অনুবাদেও তার ব্যত্যয় ঘটে নি। এটি আমার দৃষ্টিতে একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল অনুবাদকদের জন্য। কিন্তু তারা আন্তরিকতার সাথেই তাদের কাজে সার্থক হয়েছেন বলে আমি তাদের প্রশংসা করছি। এটি সম্ভবপর হওয়ার পেছনের কারণ অনুবাদকদ্বয়ের কর্মক্ষেত্র ও আগ্রহের বিষয়সমূহের দিকে আলোক প্রক্ষেপণ করলেই অনুধাবন করা যায়। শিল্পী আসমা সুলতানা একজন ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট, তিনি শিল্পকলা-শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই শিল্পের পাশাপাশি শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে জ্ঞান অর্জনে নিয়োজিত, অন্যদিক বিজ্ঞানবিষয় লেখক কাজী মাহবুব হাসানের আগ্রহের জায়গাটা হচ্ছে বিজ্ঞানের সাথে শিল্পকলার মিথোজীবীতা যা বিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থানে এসে দাড়িয়েছে। এক কথায়, তারাই এই বইটি অনুবাদ করার জন্য যোগ্যতম অনুবাদক বলে আমার অভিমত, পাঠকের মনযোগী পঠনও সেটা সহজেই আবিষ্কার করবে।

 

  ~চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে শুরু হোক নতুন করে দেখা~  

        (বইটি পড়ে আমার উপলব্ধি)

শিল্পকলা ও শিল্পসমালোচনা শব্দদুইটি অর্থভেদে আলাদা করা গেলেও এদের সম্বন্ধ নিবিড়, এরা শিল্পবোধ-উদ্ভুত পরম আত্মীয়, সহোদর। তাই শিল্পীর শিল্পকর্মের সৃষ্টিশীলতার চেয়ে দর্শকের ও সমালোচকের শিল্পসমালোচনাকে খাটো করে দেখার কিছু নেই, যা দেশ কাল ভেদে করা হয়ে আসছে। দেখার এই অযত্নের কারণ যেন জন বার্জার এর এই উক্তিতেই খুঁজে পাওয়া যায়- “কোন কিছুকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জ্ঞান ও বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত”। আমি একজন তরুন শিল্পপ্রেমিক হিসেবে জানি যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উক্তিটি কতটা প্রাসঙ্গিক ও এদেশের শিল্পচর্চার মূলে কতটা গভীরভাবে প্রথিত। স্বাধীনতা পরবর্তি সময় থেকে আজ পর্যন্ত সময়কালে বিশ্ব-শিল্পকলায় বাংলাদেশের অবদান সহজে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় না। এর কারন ঐ ‘জ্ঞান ও বিশ্বাস’,  শত বছরে যার আধুনিকায়ন হয় নি। এবং এই আধুনিকায়ন না হওয়ার কারনও চিরায়ত –প্রথাগত-গৎবাধা সেই দৃষ্টিভঙ্গি যা শিল্পসমালোচনা থেকে শুরু করে প্রায় সর্বক্ষেত্রে রয়েছে অপরিবর্তনীয়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের সেই ‘চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নতুন করে সবকিছু দেখা শুরু করবো কি না?

শিল্প সমালোচনাকে গুরুত্ব প্রদানের এই বিষয়টি খুব ভাল করে উপস্থাপিত হতে দেখেছি সদ্য প্রকাশিত বইটির ‘প্রাক কথনঃ অনুবাদকের ভূমিকা’ আলোচনায়। আমি আজ পর্যন্ত যত বই পড়েছি, কোন বইয়ের ভূমিকা পড়ে আমি এতটা প্রাসঙ্গিকতা ও আকর্ষিক-কৌতুহলোদ্দীপক বক্তব্য পাই নি। আপনারা যারা বইটি পড়বেন, তাদেরকে   সমগ্র বইটা পড়া শেষ করে পুনরায় অনুবাদকের ভূমিকা অংশটি পড়ার আহবান রাখবো। আমার মত আপনারাও হয়ত দেখবেন, এটা শুধুই একটা ভূমিকালেখ্য নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু, একটা পেইন্টিং, একটা চিত্র যা অনুবাদকেরা এঁকেছেন যেন মূল বইটিরই মূলভাষণের প্রতিলিপি স্বরুপ, একেবারে স্বতন্ত্রভাবে। এই যে- একজন পাঠক ও অনুবাদক হিসেবে অনুবাদকের দৃষ্টিভঙ্গি যা ভূমিকা বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে, তেমন স্বার্থক প্রতিলিপি সৃষ্টিকরার মত দৃষ্টিভঙ্গির অভিজ্ঞান একজন ব্যক্তি-দর্শক কিভাবে অর্জন করবেন তার খুব ভাল সহায়ক গ্রন্থ হতে পারে ‘ওয়েজ অব সিইং’।

শিল্পী-শিল্পানুরাগী-শিক্ষার্থীদের বইঃ

অনার্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘ওয়েজ অব সিইং’ বইটি বের করার পূর্বপরিকল্পনা হিসেবে বইটিকে শিক্ষার্থীদের ও শিল্পানুরাগীদের ক্রয়সাধ্য করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। বইটিতে স্থান পেয়েছে ১১৭ টি শিল্পকর্মের ছবি, বইটির বাঁধাইও মানসম্পন্ন। শিল্পী আসমা সুলতানা’র করা প্রচ্ছদটি একটি আকর্ষনীয় শিল্পকর্ম, যা বইয়ের মূল ভাবনার সাথে অসাধারণভাবে মিলে যায়।

আমি বইটি সংগ্রহ করেছি, যদিও পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে প্রকাশের পূর্বেই। বইটি পড়ে আমি বারংবার শিল্প ও শিল্পকর্মের প্রতি আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করেছি, যাচাই করে দেখেছি – দেখছি আমার ভাবনার যে বৃত্ত আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি-আচার-অনুশাসন তৈরি করে দিয়েছে তার অপ্রাসঙ্গিকতা ও মূল্যহীনতা। এই বইটি পারবে সে বৃত্তের বাইরে মুক্ত একগুচ্ছ ভাবনার পদ্ধতির সাথে পরিচয় করাতে, মৌলিক কিছু বিষয়ের সাথে পরিচয় করাতে যার ফলস্বরুপ আমাদের দেখবার পদ্ধতি তথা দৃষ্টিভঙ্গিকেই সমৃদ্ধ হবে। আপনিও বইটি সংগ্রহ করুন, বন্ধুদের উপহার দিন।

ধন্যবাদ।

…………………………

বইটির ফেসবুক পেজ

অনুবাদক আসমা সুলতানা এর ফেসবুক পেজ

অনুবাদক কাজী মাহবুব হাসান এর ফেসবুক পেজ

15622_916272065052657_7830515597674903695_n

10649996_916272161719314_1198971289882500803_n

বিধ্বংসী ভালোবাসা

শিল্পী মনন ও শিল্পকলায় ‘ভালোবাসা’ নিয়ে একটি ধারাবাহিক লেখার প্রথম পর্ব। পড়ার আমন্ত্রণ রইল।

Asma Sultana

জন্মদিন, মার্ক শাগাল , ১৯১৫, কার্ডবোর্ডে তৈলচিত্র জন্মদিন, মার্ক শাগাল , ১৯১৫, কার্ডবোর্ডে তৈলচিত্র

“শুধুমাত্র ভালোবাসাতেই আমার আগ্রহ, এবং আমি সেই সব বিষয়গুলোর সংস্পর্শে আসতে পছন্দ করি যাদের সৃষ্টি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই”- রুশ চিত্রশিল্পী মার্ক শাগালের উক্তি । পৃথিবীর তাবৎ শিল্পীদের মনের কথাই হয়তো এটা । অন্তত আমার মনের কথা তো বটেই । ভালোবাসা ছাড়া সৃষ্টি কি সম্ভব ? কখনই সম্ভব নয় । শিল্পীদের ভালোবাসার প্রকৃতি যদিও বেশ অদ্ভুত হয়ে থাকে । তারা সব কিছুকে ভালোবাসাতে পারে, আবার হয়তো বা কোনো কিছুকেই ভালোবাসে না, কিছুটা হলেও নার্সিসিজম কাজ করে এমন ভাবাটাও অমূলক নয়। এমন এক অদ্ভুত টানাপোড়নের মধ্যে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা যন্ত্রণা, হতাশা, কষ্ট বা না পাবার বেদনায় তিলে তিলে তারা সৃষ্টি করে যায় এক একটি শিল্পকর্ম, যেনো অদৃশ্য কোনো মাতৃ জঠরে জন্ম নিচ্ছে নিত্য নতুন শিশু ।

লেটার টু মাই আন বর্ন চাইল্ড, আসমা সুলতানা লেটার টু মাই আন বর্ন চাইল্ড, আসমা সুলতানা, ২০১৪, মিশ্র মাধ্যম ( কাঁচ, সোনালী ম্যাট বোর্ড, ফাইন পেপার, মরা ঘাস ফড়িং, আমার চুল, সুঁচ ও সুতা )

শিল্পীরা…

View original post 1,920 more words

প্রিয় অভিজিৎ | মুহম্মদ জাফর ইকবাল

অভিজিৎ রায় আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর অজয় রায়ের ছেলে। যারা হাসপাতালে ছিল তাদের কাছে আমাদের স্যারের খবর নিয়েছি। একজন বাবার কাছে তাঁর সন্তানের মৃত্যুসংবাদ থেকে কঠিন সংবাদ আর কী হতে পারে? আমাদের পদার্থ বিজ্ঞানের স্যার প্রফেসর অজয় রায় এই ভয়ংকর দুঃসময়ে তাঁর বুকের ভেতরের ওথাল পাথাল হাহাকার ঢেকে রেখে যে অসাধারণ মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সন্তানের মৃত্যুসংবাদ গ্রহণ করেছেন, প্রিয়জনের সাথে কথা বলেছেন, গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। আমরা তাঁর ছাত্রছাত্রীরা যদি তাঁর ভেতরকার শক্তির একটা ক্ষুদ্র অংশও আমাদের জীবনের কোথাও ব্যবহার করতে পারি তাহলে ধন্য মনে করব।
-মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সাদাসিধে কথা আর্কাইভ

ঠিক কী কারণ জানা নেই, কোনো ভয়ংকর খবর পড়লে নিজের অজান্তেই আমি নিজেকে সে অবস্থানে কল্পনা করতে শুরু করি। পদ্মা নদীতে লঞ্চডুবির খবর পড়লে আমি কল্পনায় দেখতে পাই একটা লঞ্চ ডুবে যাচ্ছে, আমি তার ভেতরে আটকা পড়েছি, পানি ঢুকছে, মানুষ আতংকে চিৎকার করছে আর পানির নিচে নিঃশ্বাস নিতে না পেরে আমি ছটফট করছি। যখন একটা বাসে পেট্রোল বোমা দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার খবর পড়ি, তখন কল্পনায় দেখতে পাই আমি বাসের ভেতর আটকা পড়েছি, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে আর আমি তার ভেতর দিয়ে ছুটে বের হওয়ার চেষ্টা করছি; আমার সারা শরীরে আগুন জ্বলছে।

পরশু দিন আমি যখন খবর পেয়েছি অভিজিৎকে বইমেলার সামনে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তখন পুরো দৃশ্যটি আমি আবার দেখতে পেয়েছি– এই দৃশ্যটি আমার জন্যে অনেক বেশি জীবন্ত; কারণ অভিজিৎ যে রকম বই মেলা ঘুরে তার স্ত্রীকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে বের হয়ে এসেছে, আমি আর আমার স্ত্রী গত সপ্তাহে ঠিক একইভাবে মেলা থেকে হেঁটে হেঁটে বের হয়ে এসেছি। আমি…

View original post 607 more words

অবশেষে….. দুটো বই প্রকাশিত..

প্রিয় মানুষ কাজী মাহবুব হাসান ও আসমা সুলতানা মিতা’র যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে দুটি যুগান্তকারী বই-এর অনুবাদ, একুশে বইমেলা-২০১৫ তে। সংগ্রহ করুন, পড়ুন পড়ান, সঙ্গে থাকুন।

জীবনের বিজ্ঞান

boiছবি কৃতজ্ঞতা: লিপন মুস্তাফিজ

পাওয়া যাচ্ছে অনার্য প্রকাশনীর স্টলে..(১৯৭-১৯৮)

View original post

মাতৃকল্প

মামাবাড়ি থেকে মাসীবাড়ির দিকে যাচ্ছি। মাঝে মাত্র আড়াই কিলোমিটার পথ। তার অর্ধেকটাই শুকনো বিলের জমির ভেতর দিয়ে চলে গেছে। চির-চেনা পথ। ধান কাঁটা হয়ে গেছে। খড়-কুটো পড়ে আছে।  আইল এখন হাটার রাস্তা। এসব ধানি-জমির উচু আইল দিয়ে কত না হেটে গেছি। কিন্তু আজ কেন জানি কষ্ট হচ্ছে খুব! খেয়াল করলাম, আজ রৌদ্র একটু বেশিই তেজ দেখাচ্ছে। আমার পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কে যেন থেমে থেমে চাবুক মারছে পিঠে। আমি খানিকটা আর্তনাদ করে উঠলাম,পিঠে কি রক্ত ঝরছে? নাহ্ তা কেন হবে! রোদে কখনও তা হয় নাকি? হঠাৎ আমি আইলের দু’পাশে জমিতে অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠলাম। একেকটি চাবুকের শব্দে জমির বুক ফেঁটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। চাবুকের শব্দ বাড়ছে, জমির ফাটল বাড়ছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আর্তনাদ-চিৎকার। কিন্তু আমিতো শব্দ করছি না। আশেপাশে তাকালাম…এই বিস্তীর্ন শুকনো জলাভুমিটিতে কেউ নেই। মানুষ নেই,গোছর দেয়া গরু নেই।জলাতংকের জীবানু বয়ে বেড়ানো পাগলা কুকুরও নেই। বুঝলাম আমার দুপাশের জমিই খরার দহনে অমন গগন-বিদারী চিৎকার করছে। অবাক হলাম খুব। জৈষ্ঠের এমন দিনেতো আমি এ পথ বহুবার পাড়ি দিয়েছি। কই কখনও’তো এমন হয় নি! ভাবলাম হয়ত গরমে আমি এসব ভুল-ভাল দেখছি।সত্যই কেমন জানি ঘোর ঘোর লাগছিল সব। ভেবেই আমি তাড়াতাড়ি পা চালাতে আরম্ভ করলাম। সামনে তাকালাম।ঐতো হিজল গাছের ভিটে দেখা যাচ্ছে। আমি একটু হাসলাম। হাসির পেছনে কারনও আছে। ছোটকাল থেকে শুনে আসছি ঐ ভিটে-টিতে নাকি অনেকে ভুত দেখেছে! ওটি আসলে এক পরিত্যাক্ত বাড়ি। জমি থেকে প্রায় ছয়-সাত হাত উচু। এখন ভিটের মাঝামাঝি একটি বয়ঃবৃদ্ধ-জরা-জীর্ণ  হিজল গাছ ছাড়া আর কিছু নেই। অতি-প্রাকৃত কাহিনীতে বিশ্বাসীদের কাছে ওটি দেখতে একটু অভিশপ্তই মনে হবে। মামাবাড়ি হতে উত্তর-পশ্চিমের গ্রামগুলোতে যাবার পথেই এই ভিটেটি বাধে। মনে পড়ে ছোট থাকতে কত গল্পই না শুনেছি এ নিয়ে। উদ্ভট সব গল্প। তখন কিন্তু ঠিকই ভয় পেতাম। ভয় পেতাম এ পথ মাড়াতেও। যদিও সে ভয় বেশি দিন টেকে নি। মনের ভেতর ক্রমেই জন্ম নেয়া ও বৃদ্ধি পাওয়া বিজ্ঞানমনষ্কতা অসংখ্য প্রশ্নের বানে রক্তাক্ত করে সমস্ত ভয় দুরে ঠেলে দিয়েছে।একবারতো মামাতো ভাই-বোনদের সাথে বাজি ধরেছিলাম…ঘোর অমাবশ্যায় এ পথ দিয়ে মামাবাড়ি হতে মাসীবাড়ি যাব। ওরা ভেবেছিল আমি কিছুদুর গিয়েই রণে ভঙ্গ দেব।ওদের ধারনা ভুল ছিল। আমি ঠিকই মাসীবাড়ি পৌছে ছিলাম।শুধু কি তাই! সে রাত্রে আমি ঐ গাছটির নিচে কিছুটা সময়ের জন্য বসেও ছিলাম। গাছটিতে নাকি পরীরা এলোচুলে বসে থাকত।দু’একজন নাকি দৃশ্যটি দেখেওছিল।তারা কয়েকজন নাকি আবার সাহস করে গাছের আগা-থেকে-গোড়া লম্বা সে চুল ধরে টানও দিয়েছিল। তাদের বুকের পাটা ছিল বলতে হবে। তবে, ব্যাথা পেয়ে যেই পরীরা অপার্থিব চিৎকার দিয়ে উঠত অমনি অজ্ঞান হত বীরপুরুষের দল। আমি দুর্ভাগা বলতে হবে।সেই বয়সটিতে আমার ভেতরে কোন রোম্যান্সের গন্ধ হয়ত পরীরা পায় নি। তাছাড়া আমি কস্মিনকালেও রসিক ছিলাম না,তাই হয়ত রুপকথার পাঁতা থেকে কোন পরী নেমে আসেনি সে রাতে।আমি এসব ভাবতে ভাবতেই হাটছিলাম।এদিকে রোদের তাপে আমার শরীর ঘেমে নেয়ে গ্যাছে।এমন সময় সামনে তাকালাম।যা দেখলাম তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ। দেখি আমি যে ভিটেটির খুব কাছে চলে এসেছিলাম তা আরও যেন দু’মাইল দুরে সরে গিয়েছে! দুরের দিগন্তে গ্রামগুলোরও কোন চিহ্ন নেই। একেবারে সাদা! চারিদিকে শুধু প্রানহীন জমি। একা আমি আর আমার সামনে সেই হিজল গাছের ভিটে…ভয়! হঠাৎ সবকিছুই দুলে উঠল। আমি জ্ঞান হারালাম।

কোথা থেকে যেন জলের মিষ্টি শব্দ শুনতে পেলাম। আমার চেতনা ফিরল, আর সারা শরীরে যেন প্রাণময় এক প্রশান্তির বাতায়ন খুলে গেল। আমি চোখ মেলে তাকালাম।দেখলাম উপরে সবুজের সমারোহ। ভাল মত খেয়াল করে দেখলাম আমি একটি বটগাছের গুড়িতে শুয়ে আছি, গাছটি চিনতে পারলাম। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতি নদী। সেই নদীর তীরেই এক স্নান-ঘাটে গাছটি শত বছর ধরে দাড়িয়ে। বটগাছটি আমার খুব প্রিয়।এই ঘাটও প্রিয়। কত না সাঁতার কেটেছি এক সময়। আজ সেসব স্মৃতি। দেখলাম কয়েকটি ছেলেমেয়ে সাঁতার কাটছে, যেন অদুরের হাঁসগুলোর সাথে আজ ওদের ডুবোডুবির প্রতিযোগিতা।আমার শরীর খানিকটা অবসন্ন ঠেকল, বিধায় ওদের সাথে যোগ দিলাম না।এমন সময় হঠাৎ মনে পড়ল সব কিছু। আরে, আমি এখানে এলাম কি করে? আমি না মাসীবাড়ির রাস্তায় ছিলাম! এখানে, নিজের গ্রামের স্নান-ঘাটে কিভাবে এলাম! দুর্বল আর নীথর মন এসবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করল না।…আর জায়গাটিও কী সুন্দর! শান্ত-শীতল।

কী এক আনন্দে আমি হেসে নিলাম। আমার হাসি দেখে, সাঁতার কাটা বাদ দিয়ে ভেজা কাপড়ে একটি বালিকা গাঙ্গ হতে উঠে এল। বিনা সংকোচে আমার মুখের খুব কাছে চলে এল। আমি অবাক হলাম ও লজ্জা  পেলাম। তারপর সে আমার কপালে তার ঠান্ডা হাত রাখল। আমার শরীর জুড়ে এক শীতল শিহরন বয়ে গেল!
-এইতো জ্বর কমে এসেছে বাবা। বলল মেয়েটি।আমি আরও অবাক হলাম। শুধালাম,-তোমার নাম কি?
-ঊর্মিলা। স্ব-হাস্যে জবাব দিল মেয়েটি।
এমন সময় কে যেন আমার মাথাটি তুলে ধরল। বুঝলাম আমার মা আমার মাথা তোয়ালের দ্বারা মুছে দিচ্ছেন।মনে পড়ল…আমার জ্বর হয়েছে।আমি সাতদিন যাবৎ বিছানায়।সাতটি দিন একটু সময়ের জন্যেও মা আমায় চোখের আড়াল করেন নি। তিনি তখন কেবল আমার মাথা পানি ঢালা শেষ করেছিলেন। আমার সারা শরীর মুছে দিয়ে উঠতে যাবেন এমন সময় আমি মায়ের বা’হাত আমার দুর্বল হাতে চেপে ধরলাম। আমার মা’কে কিছুই বলে দেয়া লাগে না।উনি সব বুঝতে পারেন।পরিশ্রান্ত মুখেও একটু হাসির রেখা টেনে মা আমার কাছে বসলেন, তারপর আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।ঠিকই বুঝে নিলাম আমার প্রতিটি স্বপ্নে- একাকী পথে মা আমারই সঙ্গে ছিলেন। আমি আবার চোখ বুজলাম। তারপর আগ্রহ ভরে আমার বালিকা মায়ের কাছে যাবার জন্য স্বপ্নের অপরিচিত দরজাগুলোতে কড়া নাড়তে লাগলাম।কারন, মা’কে যে আমার কিছু বলার আছে!

 

%d bloggers like this: